Explained: আজ নয়তো কাল, ইউরোপে হামলা করবেনই পুতিন! ধরে নিয়েই ঘর গোছাচ্ছে ইউরোপ? - Bengali News | Russia and NATO Tensions Rise, Sparking Fears of Global Conflict - 24 Ghanta Bangla News
Home

Explained: আজ নয়তো কাল, ইউরোপে হামলা করবেনই পুতিন! ধরে নিয়েই ঘর গোছাচ্ছে ইউরোপ? – Bengali News | Russia and NATO Tensions Rise, Sparking Fears of Global Conflict

Spread the love

শুরুটা হয়েছিল পোল্যান্ডকে দিয়ে। তার ৭২ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই ‘টার্গেট’ রোমানিয়া! আবার ন্যাটো (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন) -র এক সদস্য দেশের সীমান্তে রুশ ড্রোনের ‘অনুপ্রবেশ’! আছড়ে পড়ল অন্তত এক ডজন রুশ ড্রোন। এবারও সেনা, ন্যাটো-র এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানকে ছুটে যেতে হল ড্রোনগুলিকে ধ্বংস করতে। সীমান্তেও মোতায়েন করতে হল বাড়তি সেনা। কিন্তু এভাবে লাগাতার রুশ ড্রোন কেন ঢুকে পড়ছে ইউরোপে? সত্যি কি মস্কোর দাবি অনুযায়ী ‘পথ ভুল করে?’ নাকি ইউরোপ দখলের প্রস্তুতি তলে তলে সেরে ফেলছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন? তবে ইউরোপ-ও কিন্তু প্রস্তুতি নিচ্ছে। রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শুরু হয়ে গেছে ন্যাটো-র ‘অপারেশন সেন্ট্রি’। ন্যাটো সদস্য দেশগুলি সেনা বাড়াচ্ছে পূর্ব সীমান্তে। ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, পোল্যান্ড- বাড়তি অস্ত্র কিনে নিজেদের ভাণ্ডারে মজুত করছে। বিশেষজ্ঞরা দেখেশুনে বলছেন, রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এবার ইউরোপেও দাবানলের মতো ছড়াতে পারে। বাস্তবে তেমনটা হলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে যাবে। আজ বলব, ইউরোপ কীভাবে রুশ হামলা ঠেকানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, কার থেকে কত অস্ত্র কিনছে, কোথায় সেনা পাঠাচ্ছে আর কেনই বা বর্তমান পরিস্থিতিকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগাম ক্ষেত্র বলে মনে হচ্ছে?

হালে রাশিয়া-বেলারুশ সামরিক মহড়া শুরু হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি চিন্তায় রুশ সীমান্তবর্তী এস্টোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া। তাই ন্যাটো এইসব দেশে আরও সেনা পাঠাচ্ছে। ন্যাটোর ইস্টার্ন ফ্ল্যাঙ্কে – পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, সুইডেনে – ব্রিটিশ ও আলবেনিয়ান সেনা মোতায়েন রয়েছে। ফিনল্যান্ড রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত ভাগ করে বলে সেখানেও সতর্কতা বেড়েছে। সম্প্রতি পোল্যান্ডে আছড়ে পড়া ‘হারবারা’ ড্রোনে লাগানো ছিল ইরানে তৈরি অ্যান্টি-জ্যামিং জিএনএনএস অ্যান্টেনা। এই ড্রোন হামলা করলে ধরতে পারে না আক্রান্ত দেশ, যেমন পোল্যান্ডও শুরুতে পারেনি। একটা দুটো নয়, কমপক্ষে ২৩টা ড্রোন পোল্যান্ডের সীমান্তে ঢুকে পড়ার পর জানতে পেরেই ন্যাটো সতর্ক হয় ও পাল্টা হামলার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। তারপর একই ঘটনা রোমানিয়াতে। ন্যাটো সচিব নিজে বলেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন পরিস্থিতি আগে কখনও তৈরি হয়নি। এখন প্রশ্ন হল, রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ইউরোপ কেন এত চিন্তায়? আসলে ২০২২-এ রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পর থেকেই ন্যাটো-র আশঙ্কা, রাশিয়া শুধু কিভ দখল করেই থামবে না। একের পর এক ড্রোন-কে এগিয়ে দিয়ে পুতিন আসলে ন্যাটোর ধৈর্য পরীক্ষা করছেন। ন্যাটো মনে করে, যুদ্ধপিপাসু পুতিন আসলে এখন ন্যাটো সদস্যদের শক্তি-খামতি, এইসবের পরীক্ষা নিচ্ছেন। আসল হামলা শুরু করবেন, বছরখানেকের মধ্যেই। এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন খোদ ন্যাটো-র সাধারণ সচিব। মার্ক রুট মনে করেন, ইউক্রেন দখল হয়ে গেলে পুরো ইউরোপ দখলই নাকি পুতিনের আসল লক্ষ্য। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পুতিন ইউরোপে আক্রমণ করতে পারেন বলেও তিনি এক সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেছেন।

এবার আসি ইউরোপের অস্ত্র কেনার প্রসঙ্গে। ইউরোপের দেশগুলি এখন প্রচুর অস্ত্র কিনছে, কারণ তাদের আগের স্টক শেষ হয়ে গেছে ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ করতে করতে। ২০২২-এর আগে ইউরোপের প্রতিরক্ষা খাতে খরচ জিডিপির ১.৫ শতাংশ ছিল, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৫ শতাংশে। ন্যাটো বলছে, তাদের সদস্যদের সকলকে অন্তত ৫ শতাংশ জিডিপি প্রতিরক্ষা খাতে খরচ করতে হবে। সম্প্রতি ইইউ (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) ঘোষণা করেছে, প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ইউরো খরচ করে অত্যাধুনিক সামরিক অস্ত্র কেনার, যার মধ্যে প্রায় ১৫০ বিলিয়ন ইউরো ধার করা হবে। তবে এই থেকে অস্ত্র কিনতে হবে ইউরোপীয় কোনও সংস্থা থেকেই। আমেরিকা, ইজরায়েল বা তুরস্ক-র কাছ থেকে নয়। যেমন ফরাসি প্রেসিডেন্ট চান, এইসব অস্ত্র ‘মেড ইন’ ও ‘মেড বাই ইউরোপ’ হোক, যাতে তাঁদের নিজেদের দেশেরও শিল্প ও কর্মসংস্থান বাড়ে। একেই ফ্রান্সের অর্থনৈতিক অবস্থা এখন বেজায় টালমাটাল। প্যারিসের রাস্তায় যুবক-যুবতীরা নেমে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন চাকরির দাবিতে। কিন্তু পোল্যান্ড বা নেদারল্যান্ডসের মতো দেশ আবার চায়, যেখান থেকে সস্তায় পাওয়া যাবে- সেখান থেকেই সামরিক সরঞ্জাম কিনতে। ‘ইইউ’ মনে করে, রুশ আগ্রাসন থামাতে ও ইউরোপকে মার্কিন ছত্রছায়া থেকে বার করে এনে ‘সাবালক’ করতে লাগবে কয়েক হাজার ট্যাঙ্ক, কয়েক লক্ষ আর্টিলারি শেল আর অন্তত পাঁচ গুণ বেশি এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম। কারণ, আজ শুধু ইউক্রেনকে-ই বছরে প্রায় ২০ লাখ আর্টিলারি রাউন্ড, মিসাইল ও ড্রোন সরবরাহ করতে হয়। একটা উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে। আজ একা জার্মানি প্রায় ৬৭ বিলিয়ন ইউরো খরচ করেছে শুধু সেনার ব্যারাকগুলি মেরামতির জন্য। পোল্যান্ড এই মুহূর্তে গোটা ইউরোপের কাছ থেকে অস্ত্র পাওয়ার জন্য ছুটে বেড়াচ্ছে। ন্যাটো চাপে পড়ে খানিকটা এয়ার ডিফেন্স আর লজিস্টিকস দিয়ে সাহায্য করলেও সেটা অপ্রতুল। এখনও ইউরোপের অনেক দেশ-ই আমেরিকার কাছ থেকে অস্ত্র কিনছে, কারণ ইউরোপের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের হার এখনও বেশ দুর্বল, দামও বেশি। দ্য গার্ডিয়ানের সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, ২০২০ থেকে ইউরোপ অন্তত কয়েক হাজার মিসাইল কিনেছে আমেরিকা, ইজরায়েল ও দক্ষিণ কোরিয়া-র কাছ থেকে। যার মধ্যে রয়েছে প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স মিসাইল, ক্রুজ মিসাইল। এদিকে ট্রাম্পের প্ল্যান, ইউরোপীয় দেশগুলি আমেরিকার কাছ থেকে অস্ত্র কিনে ইউক্রেনকে দিক। নরওয়ে, চেক রিপাবলিকের মতো দেশ এটা করতে রাজি। এতে আমেরিকার ভাঁড়ারে নগদের সরবরাহও বাড়বে। কিন্তু ইউরোপ এখন চায়, ট্রাম্পের ছত্রছায়া (পড়ুন দাদাগিরি) থেকে বেরিয়ে অস্ত্র উৎপাদনে স্বনির্ভর হতে। এতে দেশীয় সংস্থাগুলিও ফুলেফেঁপে উঠবে ও ইউরোপ জুড়ে পাউন্ডের লেনদেন বাড়বে। ফলে দেশে সরকারি বিরোধী জনগণকেও খানিক শান্ত করা যাবে।

এবার সেনা মোতায়েনের কথায় আসা যাক। ইউরোপ এখন পূর্ব সীমান্তে সেনা বাড়াচ্ছে। রাশিয়া-বেলারুশ সামরিক মহড়ার জেরে সবচেয়ে বেশি চিন্তায় এস্টোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়ার মতো রুশ সীমান্তের কাছাকাছি থাকা দেশগুলি। ন্যাটো সেখানে আরও সেনা পাঠাচ্ছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ চান, ইউক্রেনে যুদ্ধ শেষ হলে সেখানে ২৬টা দেশের ‘রি-অ্যাসিওরেন্স ফোর্স’ পাঠাতে, কিন্তু তাঁর প্রস্তাবে জার্মানি, স্পেন, ইতালি এখনও রাজি নয়। ন্যাটোর ইস্টার্ন ফ্ল্যাঙ্কে পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, সুইডেনে ইতিমধ্যেই ব্রিটিশ ও আলবেনিয়ান সেনা মোতায়েন হয়েছে। ফিনল্যান্ড রাশিয়ার সঙ্গে অনেকটা সীমান্ত ভাগ করে নেয়, তাই স্বাভাবিকভাবে সেখানে বাড়তি সতর্কতা। ব্রিটেন জানে, ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুধু মাটি বা আকাশে নয়, হবে সাইবার দুনিয়া এমনকী মহাকাশেও। তাই গবেষণা ও অস্ত্র উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়াচ্ছে তারা। রাশিয়াকে দেখাতে যে, আমরাও প্রস্তুত।

এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, কেন এই পরিস্থিতিকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বলে মনে হচ্ছে? কারণ, রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন আগাম হুমকি দিয়েই রেখেছেন, ন্যাটোর সঙ্গে যুদ্ধ হলে সেটা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ-ই হবে। আসলে মস্কো-র মনোভাবই হল, ন্যাটোর সঙ্গে চোখে চোখ রেখে শক্তি প্রদর্শন করে যেতে হবে। অনেকটা স্নায়ুযুদ্ধের মতো। ন্যাটো সচিবের অভিযোগ, রাশিয়া আড়ালে আবডালে ইউরোপে ‘হাইব্রিড ওয়ার’ চালাচ্ছে। পোল্যান্ড, রোমিনিয়ায় ড্রোন ঢোকাচ্ছে, এয়ার ডিফেন্সের জিপিএস জ্যামিং করছে। সবমিলিয়ে নাকি ‘স্যাবোটাজ’ তিন গুণ বেড়েছে। ন্যাটোর বয়ান অনুযায়ী, এটা ‘গ্রে-জোন ওয়ার’, মানে সরাসরি সংঘাতে না হেঁটেও ইউরোপে টালমাটাল পরিস্থিতি তৈরি করা। ন্যাটো আবার ভয়ে আছে, ট্রাম্প যদি সত্যি সত্যি ন্যাটো ছেড়ে বেরিয়ে যান, তাহলে কী হবে? তখন তো রুশ ভাল্লুকের সামনে ইউরোপ একা! বিবিসি বলছে, এটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় ‘ক্রাইসিস’। ওদিকে, পুতিনের ডেপুটি মেদভেদেভ হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন, ক্রিমিয়ায় ন্যাটো ঢুকলে-ই বিশ্বযুদ্ধ! আসলে এটা সত্যি, যে ন্যাটোর ক্রমাগত শক্তিবৃদ্ধি, ট্রাম্পের আশ্বাস, ফিনল্যান্ড-সুইডেনের যোগদান – রাশিয়াকে চাপে রেখেছে। রাশিয়া যদি একবার ন্যাটো-র কোনও সদস্যকে আক্রমণ করে, তাহলে ন্যাটো-ও ‘আর্টিকেল ৫’ শুরু করবে। মানে সবাইকে যুদ্ধে টেনে আনবে। সেটা পারমাণবিক যুদ্ধও হতে পারে। সেটা মাথায় রেখেই কি পুতিন রাশিয়া-বেলারুশ সামরিক মহড়াতে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা করে দেখে নিতে চাইছেন? প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখন আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দুটো দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং, এদিকে রাশিয়া ও অন্যদিকে ইউরোপের সম্পর্কের ভারসাম্য দাঁড়িয়ে রয়েছে এই যুদ্ধের ভবিষ্যতের উপর। আর আমেরিকা এই দ্বন্দ্বে কোনদিক নেয়, সেটাও দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *