Malda: ‘আমরা তো হিন্দি বলতে পারি না…যদি মারে তখন?’, ভয়ে ভিন রাজ্যে যেতে চাইছেন না ঢাকিরা

মালদহ: ভিন রাজ্যে যাবেন না প্রায় ৫- ৬ হাজার ঢাকি। অনেক অনেক বেশি রোজগারের হাতছানি থাকলেও ‘না’। কারণ,বাংলাভাষী হলে আক্রান্ত হওয়ার আতঙ্ক। তাই উত্তরপ্রদেশে, দিল্লি এবারে আর যাবেন না তাঁরা। কিন্তু ঘরে খবারও নেই। ঘরে উনুনে আগুন জ্বলে না নিয়মিত। তাই মালদার ১২ হাজার ঢাকি ভুগছেন চরম অর্থ কষ্টে। নিয়মিত অন্ন জোটানোই দায় পড়েছে তাঁদের। এই পরিস্থিতিতে ভরসা ছিল ভিন রাজ্যে গিয়ে ঢাক বাজিয়ে অর্থ রোজগার। কিন্তু এবারে তাও বন্ধ!
প্রতিবার এই সময় হয়ে যায় ঢাকিদের বায়না। ভিনরাজ্যের দুর্গাপুজোগুলিতেও ঢাক বাজানোর জন্য বায়না আসে তাঁদের কাছে। কিন্তু এবারের দুর্গাপুজোটা আলাদা। বারবার অভিযোগ উঠছে ভিন রাজ্যে হেনস্থা করা হয়েছে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের। বাংলা ভাষায় কথা বললেই তাঁদের বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেই কারণে ভয়ে রয়েছেন তাঁরা। পাছে ফের বাইরে গেলে হেনস্থা করা হয় তাঁদের… শঙ্কর রবি দাস বলেন, “আমরা উত্তর প্রদেশ যেতাম। দিল্লি যেতাম। এখন আর যাব না। যেতে চাই না একটাই কারণে, যা শুনছি বাইরে গেলেই মারছে। আর আমরা তো হিন্দি কথা জানি না। আমরা বাঙালি। যদি মারে তাই যেতে পারছি না।”
মালদা বিশেষ করে গৌড়বঙ্গ, যেখানে ঢাকের বোল একে বারেই অন্যরকম। প্রাচীন কাল থেকেই এই ঢাকের চেহারার ধরন এবং তার বোল উত্তরবঙ্গ বা দক্ষিণবঙ্গের সঙ্গে মেলে না। শব্দ জোড়াল নয়, কিন্তু গম্ভীর ও সুমিষ্ট বলেই দাবি করা হয়। আর এই কারণেই মালদা জেলার ঢাকিদের ভিন রাজ্যে বরাবরই কদর খুব বেশি। বিশেষ করে লখনউ, বেনারস, দিল্লিতে মালদহে ঢাকিদের কদর সব থেকে বেশি। লখনউতে তো মালদার ঢাকি না হলে চলেই না। তাই মোটা বায়না দিয়েই মালদার ঢাকিদের নিয়ে যাওয়া হয়।
মালদায় মূলত রবিদাস সম্প্রদায়ের লোকেরাই ঢাক বাজায়। জেলার সব ব্লকেই হাজার – বারোশো করে তাঁরা আছেন। এর মধ্যে ইংরেজবাজার, গাজোল, হরিশ্চন্দ্রপুর, মানিকচক ইত্যাদি ব্লকে তাঁদের সংখ্যা বেশি। তাঁদের আলাদা আলদা দল বা কমিটি আছে। জেলার ঢাকিদের অভিযোগ, বার-বার আবেদন করার পরেও সরকার থেকে কোনও ‘শিল্পী ভাতা’ ঢাকিরা পায় না। এখন পুজোর বাজেট কয়েক গুন বেড়েছে। কিন্তু সেই সাবেকিয়ানা নেই। মণ্ডপে ঢাক বাজে না। ঢাকিদের ডাকা হয় না, বরাতও দেওয়া হয় না। যন্ত্রে ঢাক বাজিয়ে দেওয়া হয় আরতির সময়ে। ফলে সার্বিকভাবে রোজগার বন্ধ ঢাকিদের। বাধ্য হয়ে কেউ রঙের মিস্ত্রি হচ্ছে, কেউ ঘুগনি মুড়ি বিক্রি করতে যাচ্ছে, কেউ রিক্সা চালাচ্ছে বা দিনমজুর হচ্ছেন। নিজের ছেলেদের ঢাক বাজানো শেখাতেও ভয় পাচ্ছেন তাঁরা। অথচ পূর্ব পুরুষ ধরে এই ঢাক বাজানোই পেশা তাঁদের। বিমল রবি দাস বলেন, “এই জেলায় প্রায় ১২ হাজারের মতো ঢাকি আছে। তাঁদের অবস্থা ভাল না। অর্ধাহারে আছে। ঢাকের চাহিদা কমছে।”
অন্যদিকে মালদা জেলা প্রশাসন ও তথ্য দফতর সূত্রের খবর, ঢাকিদের লোকশিল্পী হিসেবে ধরাই হয় না, যদি গম্ভিরা, মুখা নাচ, বা অন্যান্য কোনও লোক নৃত্যের সঙ্গে তাঁরা যুক্ত না থাকে। ২০১৭ পর্যন্ত জেলায় লোক শিল্পীদের তালিকায় ছিল ৪ হাজার ৭০০ জনের নাম। যার মধ্যে মুখা শিল্পী, গম্ভীরা শিল্পী, আলকাফ শিল্পী, বিষহরি শিল্পী ইত্যাদিরা রয়েছেন। এই তালিকাও এখন কমে সাড়ে তিন হাজারে এসেছে। কিন্তু এখন আর নতুন শিল্পীর নাম নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ।
এদিকে এই নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। বিজেপি নেতা বলছে, “এখানে অনেক ঢাকি রয়েছেন। এদের আলাদা চাহিদা আছে। আর এদের চাহিদা উত্তরপ্রদেশ, বেনারসে আছে। সেই কারণে মালদহর ঢাকি চায়। বাইরে তো আরও বাঙালি আছে, তাঁদের তো অসুবিধা হচ্ছে না। যাঁদের সমস্যা আছে তাঁদেরই অসুবিধা হচ্ছে।”