EXPLAINED: স্বামীজির দেখানো পথে আজও অমরনাথ টানে বাঙালিকে, কী বলছেন পুণ্যার্থীরা? – Bengali News | In Depth: why Bengali pilgrims have special feeling for Amarnath Yatra?
তন্ময় মুখোপাধ্যায়ের রিপোর্ট
একান্ন পীঠের এই পীঠ, বাকি পঞ্চাশ পীঠের থেকে ঢের আলাদা। যে গুহায় মহামায়াকে অমরত্বের কাহিনি শুনিয়েছিলেন দেবাদিদেব, সেই তীর্থ বাঙালিকে যেন পরিব্রাজক হতে শিখিয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দর দেখানো পথে এবারও অমরনাথের পথে বাঙালি।
আক্ষরিক অর্থেই দুর্গম গিরি। সামনে শুধুই চড়াই। আর ঘাড় ঘোরালে বিরাট খাদ। এমনই শৈবতীর্থে হাজির পরিব্রাজক বাঙালি। শয়ে-শয়ে, হাজার-হাজার। স্বামী বিবেকানন্দর শেষ তীর্থযাত্রা যেখানে, সেই অমরনাথ মুখরিত বাঙালির বোলে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে ট্রেক করে, প্রায় চার হাজার ফুট উপরে উঠা। আবার সেই দিনেই নেমে আসা। চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। যাঁরা বালতাল রুট দিয়ে অমনরাথের উদ্দেশে বেরোন, তাঁরা প্রায় ৯ হাজার ফুট, মানে বালতাল বেস ক্যাম্প থেকে হাঁটা শুরু করেন। খাড়াই রাস্তা ধরে ১২ হাজার ৭৫৬ ফুট উঠে পবিত্র গর্ভগৃহে পা রাখা। এই কারণে সময় বেশি লাগলেও, পথের কষ্ট খানিকটা ভুলতে পহেলগাঁওর রুট ধরেন অধিকাংশ পুণ্যার্থী।

এবার অমরনাথ যাত্রা শুরু থেকেই দুর্যোগের কারণে বারবার ব্যাহত হয়। কখনও মেঘভাঙা বৃষ্টির জন্য বালতাল রুট বন্ধ হয়েছে। কখনও আবার পহেলগাঁও রুট। আর যাত্রার শেষের দিকে শুধু বালতাল দিয়ে যাওয়ার অনুমতি। আর সেই যাত্রাপথ অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। আর সেই কঠিন পথে এগোতে গেলে অনেকেরই ভরসা ট্রেকিং শ্যু।
এর মধ্যেও আলাদা অনেকে। যাঁরা এই ভাঙাচোরা, ধুলো ওঠা পাথুরে রাস্তায় খালি পায়ে বিদ্ধ হতে হতে মহাদেবের কাছে পরীক্ষা দিয়ে যান! এঁদেরই একজন সুজয় মাইতি। পশ্চিম মেদিনীপুরের দাসপুরের এই বাসিন্দার কথায়, “অমরনাথ আসার পর ট্রেন যাত্রীদের অনুপ্রেরণায় আমার এই খালি পায়ে হাঁটা।” সুজয়ের আরও একদিন খালি পায়ে অমরনাথ যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ২ অগস্ট তড়িঘড়ি যাত্রা বন্ধ করে দেওয়ায় তা আর হয়নি। সুজয়ের মতো খালি পায়ে হাঁটার ব্রত নিয়ে শ্যামবাজার থেকে অমরনাথের পথে অভিলাষ মান্না। বছর পঁয়ত্রিশের অভিলাষ বলছেন, “মোক্ষলাভের এটাই রাস্তা। তাই পা কেটে যাক, যতই আঘাত পাই, পরোয়া করছি না। দেবাদিদেবের শক্তি এভাবেই পাই।”
হাজার হাজার পুণ্যার্থীর ভিড়ে আলাদা দিল্লির নীতীশ মাহেশ্বরী। নীতীশের একটি পা ছোট থেকে অসাড়। ক্র্যাচই তাঁর ভরসা। সেই ক্র্যাচে ভর করেই এক পায়ে প্রায় অসাধ্য সাধন! নীতীশ বলছেন, “এক পা নেই তো কী হয়েছে, মনের জোর আছে। আর আছে শিবের শক্তি। তার জন্য দিল্লি থেকে ছুটে আসা।”

এ তো গেল পুণ্যার্থীদের কথা। আর এই অমরনাথ কেন বাঙালিদের কাছে আলাদা অর্থের তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। তাঁর দেখানো পথেই বাঙালির অমরনাথের প্রতি কৌতূহল। ভগিনী নিবেদিতাকে সঙ্গী করে, ১৮৯৮ সালের ২ অগস্ট স্বামীজি পবিত্র গুহা দর্শন করেন। তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় হল, এবছর ২ অগস্ট শেষ হয় অমরনাথ যাত্রা। প্রবল দুর্যোগের কারণে আগেভাগেই বন্ধ হয়ে যায় অমরনাথ দর্শন। ঐতিহাসিক ২ অগস্ট অমরনাথ গুহা দর্শন করতে পেরে ধন্য বনগাঁর বাসিন্দা তাপস বৈরাগী। পুণ্যার্থীর কথায়, “এমন একটা দিনে বাঙালি হিসেবে তীর্থে পৌঁছাতে পেরে গর্ব অনুভব করছি। ট্রেক করে এতটা রাস্তা যাওয়া কঠিন মনে হলেও, ভগবানের কৃপায় আমরা পৌঁছাতে পেরেছি।”

ইতিহাস বলে, পবিত্র গুহা দর্শন সেরে স্বামীজি বলেছিলেন, “যখন আমি অমরনাথে গেছি, তখনই শিব আমার মধ্যে প্রবেশ করেছেন। তিনি আমায় ত্যাগ করবেন না।” আসলে শিব তো শুধু একটা নাম নয়, তিনি এক অদৃশ্য শক্তি। যে শক্তি বাঙালি খুঁজে পেয়েছিল স্বামী বিবেকানন্দর মধ্যে। দেশজুড়ে শুরু হয়েছিল শিব জ্ঞানে জীব সেবার কর্মযজ্ঞ। তাঁর দেখানো সেই পথ ধরেই যেন বাঙালির ও দেশের মোক্ষলাভ।