Explained: পাতাল থেকে উঠে 'নতুন' ইরান দেখবেন খামেনেই? - Bengali News | Iran's Supreme Leader Faces a Transformed Nation Upon Emergence from Hiding - 24 Ghanta Bangla News
Home

Explained: পাতাল থেকে উঠে ‘নতুন’ ইরান দেখবেন খামেনেই? – Bengali News | Iran’s Supreme Leader Faces a Transformed Nation Upon Emergence from Hiding

Spread the love

তেহরান: প্রায় দু’হপ্তা হয়ে গেল ইরানের সুপ্রিম লিডার, ৮৬ বছরের আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই বাঙ্কারে লুকিয়ে রয়েছেন। ইজরায়েলের সঙ্গে তেহরানের যুদ্ধবিরতির পর খামেনেই অবশেষে বাঙ্কার থেকে বেরোতে চলেছেন। ইতিমধ্যেই, আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ বাহিনীর বিরুদ্ধে ইরান ‘জয়’ পেয়েছে বলে বাঙ্কার থেকেই বার্তা দিয়েছেন। আজকালের মধ্যেই সম্ভবত দেশবাসীর উদ্দেশ্যে টিভিতে ভাষণও দেবেন। অন্তত ঘনিষ্ঠ সূত্রে এমনটাই জানা গেছে। ইজরায়েলের হামলার ‘ভয়ে’ বাঙ্কারে লুকিয়ে ছিলেন খামেনেই। এমনকী ইরানের শীর্ষ সরকারি কর্তারাও তাঁর মুখদর্শন করতে পারেননি। বার্তা পাঠিয়েছিলেন চিরকুটে লিখে। সঙ্গে রাখেননি কোনও ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস। বাঙ্কারে ‘সঙ্গী’ বলতে শুধুই ইরানের এলিট কমান্ডো ফোর্স।

এতদিনে সকলেরই জানা হয়ে গেছে, কাতার ও ট্রাম্পের দৌত্ম্যে তেল অভিভ ও তেহরানের মধ্যে আপাতত সংঘর্ষবিরতি ঘোষণা হয়েছে। কিন্তু তারপরেও দিনকয়েক প্রকাশ্যে আসেননি খামেনেই। আসলে ভয়ে ছিলেন, ইজরায়েলি সেনা তাঁকে খতম করে দিতে পারে। যদিও ট্রাম্প আশ্বাস দিয়েছিলেন, খামেনেইকে প্রাণে মারার কোনও পরিকল্পনা ওয়াশিংটনের ছিল না। মুশকিল হল, ট্রাম্প একথা বললেও, ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী সেটা বলেননি। আর তাই, সম্ভবত সংঘর্ষবিরতি হলেও বাইরের হাওয়াটা বুঝে নিতে চাইছেন খামেনেই। আবার এটাও ঠিক, খামেনেই বাইরে এলে তিনি এক ‘নতুন’ ইরান দেখতে পাবেন। এই ইরানের বেশ কিছু এলাকা এখন কার্যত ধ্বংসস্তূপ। খামেনেই বাঙ্কার থেকে বেরিয়ে নিশ্চয় জয়ের ঘোষণা করবেন, নিজের ‘ইমেজ’ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করবেন কিন্তু বাঙ্কারে প্রবেশের আগের জমানার সেই দাপট ফিরে পাবেন কি?

ইজরায়েল ইরান যুদ্ধের কয়েকদিনেই ইরানের এয়ারস্পেস নিজেদের দখলে আনার দাবি করে ইজরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স। বেছে বেছে ইরানের সেনাঘাঁটি, পারমাণবিক কেন্দ্র, বিজ্ঞানী ও শীর্ষ সেনাকর্তাদের নিশানা করে নিকেশ করা হয়। রেভোলিউশনারি গার্ডের শীর্ষ কমান্ডাররা দায়িত্ব নেওয়ার চারদিনের ব্যবধানে ইজরায়েলি সেনার হামলায় নিহত হন। ধ্বংস হওয়া সেনাঘাঁটি পুনর্গঠন, পারমাণবিক কেন্দ্রগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করতে ইরানকে এখন দেশের জিডিপির বেশ খানিকটা বাড়তি খরচ করতে হবে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও শুধুমাত্র পরমাণু গবেষণাতেই গত দু’ দশকে ইরান কয়েকশো কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছিল। সেই গবেষণাগারগুলিকেও নতুন করে গড়তে হবে। প্রথমে অস্বীকার করলেও এখন ইরান স্বীকার করে নিয়েছে, মার্কিন বোমায় অন্তত তিনটি পারমাণবিক কেন্দ্র কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সেগুলি সারাতে আবার আমেরিকার কাছ থেকেই অর্থ দাবি করেছে তেহরান। এর পাশাপাশি, ইজরায়েলের বিরুদ্ধে লাগাতার ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুঁড়েও নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডারের অনেকটাই খরচ করে ফেলেছে তেহরান। যুদ্ধে হওয়া ব্যাপক খরচের ধাক্কা যে ইরানের পক্ষে এই অবস্থায় সামলানো সহজ হবে না, মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।

ইজরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিপুল খরচ, কয়েকশো কোটি টাকা খরচ করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণের কাজ চালিয়ে যাওয়া, শেষে আবার মার্কিন চাপের কাছেই ‘নতিস্বীকার’ করে সংঘর্ষ বিরতি, সবোর্পরি ইরানের প্রায় ৯৫০ জন নাগরিকের মৃত্যুর (ইরানের দাবি অবশ্য ৬২৫ জনের আশেপাশে) দায় কিন্তু সুপ্রিম লিডারের কাঁধেই চাপাবেন ইরানের একটা বড় অংশের মানুষ। ইরানের মানুষকে খামেনেই স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, ইজরায়েলকে ধ্বংস করে দেবেন। বহু ইরানিই অবশ্য তাঁর সঙ্গে একমত হননি। খামেনেই ঠারেঠোরে এটাও বুঝিয়েছিলেন, একবার ইরান পরমাণু বোমা বানিয়ে ফেললে মার্কিন বা ইজরায়েলি দাদাগিরি সহ্য করতে হবে না। কিন্তু সেই স্বপ্নও আপাতত কয়েক বছর পিছিয়ে গেল ইরানি পরমাণু ঘাঁটিতে মার্কিন ‘বি-২’ বোমারু বিমান হানায়। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রেখে দেশের বৃহত্তম বাণিজ্য রুট স্তব্ধ করে রেখেছে তেহরান। তার উপর রয়েছে মার্কিন ও ইউরোপের চাপানো নানা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অধ্যাপক লিনা খাতিব সম্প্রতি বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘এই বহুমুখী চাপের কাছে ইরানের বর্তমান শাসকদল কতদিন টিকে থাকতে পারবে তার ঠিক নেই। দেখেশুনে মনে হচ্ছে এটা তাদের শেষের শুরু।’ তাঁর কথায়, খামেনেই সম্ভবত ইরানের শেষ সুপ্রিম লিডার হতে চলেছেন। সেন্ট অ্যান্ড্রিউস বিশবিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অফ ইরানি স্টাডিজের ডিরেক্টর অধ্যাপক আলি আনসারির কথায়, ‘দ্রুতই দেশের মধ্যেই খামেনেইয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখা দেবে। সাধারণ মানুষ খেপে রয়েছেন। এখন ইন্টারনেট বন্ধ রেখে বাইরের দুনিয়াকে সেটা টের পেতে দেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যেও ব্যাপক মতভেদ রয়েছে।’

যুদ্ধ চলাকালীন ইরানের সাধারণ মানুষ কিন্তু ব্যাপক ধৈর্য দেখিয়েছেন। ইরানি সংবাদমাধ্যম দেখিয়েছে ইরানের মানুষ কীভাবে যুদ্ধে গৃহহীনদের নিজেদের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন। মুদির দোকানি ফ্রিতে রেশন বিলি করেছেন। যদিও, তাঁরা এটাও জানেন, ইজরায়েলের হামলার মূল লক্ষ্য খামেনেইকে গদিচ্যুত করা। আসলে ইরানেও অনেকে চান, খামেনেই শাসনের অবসান হোক। কিন্তু প্রকাশ্যে বলতে পারেন না। নিজের প্রায় ৪০ বছরের শাসনে খামেনেই বিরোধী দলের মুখ বন্ধ করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ। দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশিদিন যে সব স্বৈরাচারীরা শাসন করে গেছেন, খামেনেই তাঁদেরই একজন। বিরোধীদের হয় জেলে পুরেছেন, নয়তো খতম করেছেন, নয়তো দেশ থেকে তাড়িয়ে ছেড়েছেন। এখন ইরানের শীর্ষ কর্তারা তাই আর কাউকেই বিশ্বাস করতে রাজি নন। মার্কিন ও ইউরোপিয়ান সংবাদমাধ্যমের দাবি, গত ২ সপ্তাহে ইজরায়েলের চর সন্দেহে অন্তত ৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে তেহরানে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৭০০ জন নাগরিককে। কে ইরানের নাগরিক আর কে ইজরায়েলের গুপ্তচর– আলাদা করতে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন। এই ব্যাপক ধরপাকড়ের বিরুদ্ধেও খেপে রয়েছেন ইরানের মানুষ। তাঁদের রাগ গিয়ে পড়েছে খামেনেইয়ের উপর। কেন সুপ্রিম লিডার দেশের এই কঠিন সময়ে নিজে বাঙ্কারে লুকিয়ে থেকে দেশের মানুষকে যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিলেন, এখন ইরানের মানুষ সেই প্রশ্ন তুলছেন। ঠিক এক মাস আগেও ইরানে যেটা ভাবা যেত না। তবে কি ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধে, ইরানের সুপ্রিম লিডার শারীরিকভাবে বেঁচে গেলেও, তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ারের মৃত্যু হল?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *