Explained: সংঘর্ষ বিরতি লঙ্ঘন করে কতটা ভুল করল পাকিস্তান? – Bengali News | Pakistan Violated Ceasefire Agreement, What it Means For India
কলকাতা: তখন দুপুর ৩টে ৩৫ মিনিট। পাকিস্তানের DGMO-এর দফতর থেকে ফোন এল ভারতের DGMO দফতরে। ফোনালাপে কী বলা হল? তা সম্পূর্ণ ভাবে জানা না গেলেও, বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রি জানিয়েছেন, ওই ফোনালাপে ভারতের কাছে সংঘর্ষ বিরতির জন্য আর্জি জানিয়েছে পাকিস্তান। সেই সূত্র ধরেই বিকাল ৫টা থেকে স্থল, জল, আকাশপথে চলা সমস্ত রকমের সংঘর্ষ থেকে বিরতি টানার সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় সরকার।
কিন্তু বিকাল পাঁচটায় সংঘর্ষ বিরতির সিদ্ধান্তের পর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই হয় ‘মোহভঙ্গ’। সূর্য ডুবতেই নিজের ‘আসল’ রূপে ফেরে পাকিস্তান। উত্তরে কাশ্মীর থেকে পশ্চিমে ভূজ ও জয়সলমীরে চলে হামলা। বিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে গুলি চালায় পাক সেনা। কাশ্মীরের আকাশে দেখা যায়, জ্বলন্ত গোলার মতো ছুটে বেড়াচ্ছে পাক ড্রোন। যখন-তখন ঘটছে বিস্ফোরণ। স্থানীয় সূত্রে খবর, তিন ঘণ্টার মধ্যে শুধুমাত্র কাশ্মীরেরই ১১টি জায়গায় হামলা চালিয়েছে তারা। এই প্রসঙ্গে নিজের এক্স হ্যান্ডেলে সাইরেন বাজার ও পাক ড্রোন ওড়ার ভিডিয়ো তুলে ধরেন খোদ জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্য়মন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহও।
তবে এই ফাঁকে আরও একটি বিষয় বলে রাখা দরকার। গোটা সংঘর্ষ বিরতি পর্যায়ে মধ্যস্থতা করেছে আরও একজন। তা হলেন ট্রাম্প। মার্কিন মসনদে ফেরার পর থেকে বিশ্ব রাজনীতিতে শান্তির প্রতীকে পরিণত হয়েছেন তিনি। ইজরায়েল-হামাস মিটমাট থেকে রুশ-ইউক্রেন সমঝোতা, এবার আবার ট্রাম্প ঢুকে পড়়েছেন ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চলা সংঘাতেও। তবে এই মধ্যস্থতা কি আদৌ সোজা চোখে দেখছে ভারত? নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত-পাক সংঘাত নিয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জানিয়েছেন, ‘কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত মনে করে না, কারওর মধ্যস্থতার প্রয়োজন রয়েছে।’
যে পাকিস্তান আমেরিকার কাছে হাত পেতে ভারতের প্রত্যাঘাত বন্ধ করার জন্য কাকুতি-মিনতি করে গেল। সেই পাকিস্তানই আবার রাতের অন্ধকারে কেন চুক্তি লঙ্ঘন করল? ঘুরপথে ভারতকে যুদ্ধে নামাতেই কি আবার ঘুঁটি সাজাচ্ছে তারা? নাকি সেনা ও প্রশাসনের মধ্যে এখনও রয়ে গিয়েছে একটা বড় ফাঁক?
বিশ্বের কাছে কী বার্তা রেখে গেল পাকিস্তানের সংঘর্ষ বিরতি লঙ্ঘন?
কূটনীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসলে ঘুরপথে ভারতকে যুদ্ধের আস্ফালনে ঢাকতেই এই ধরনের কার্যকলাপ করছে তারা। পহেলগাঁও হামলার পর থেকেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে সমবেদনা কুড়োতে ব্যস্ত হয়েছে পাকিস্তান। ভারতের বিরুদ্ধেই অভিযোগ তুলে রাষ্ট্রপুঞ্জ হোক বা তাদের মিত্র দেশ, সব জায়গাতেই নিজেদের নিষ্পাপ প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লাগে পাক সরকার। এই হামলা সেই ষড়যন্ত্রেরই একটা ছক। সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, পাকিস্তান থেকে হওয়া যে কোনও প্রকার সন্ত্রাসবাদী হামলাকে এবার যুদ্ধে উস্কানি রূপেই দেখবে ভারত। এই ঘোষণা যখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে, সেই আবহে প্রথমে যুদ্ধবিরতির কথা তুলে তারপর পিঠে ছুরি। সবটাই আসলে ভারতকে ঘুরপথে যুদ্ধে নামানোর একটা পরিকল্পনা মাত্র। এমনকি, গতকাল যখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সীমান্তে সংঘর্ষ বিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেন বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রি। তারই ঘণ্টা খানেক পরে একটি বিবৃতির মাধ্যমে অভিযোগ নস্যাৎ করেন পাক বিদেশ মন্ত্রক। সেই বিবৃতিতে জানানো হয়, ‘পাকিস্তান সংঘর্ষ বিরতি কার্যকর করতে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিছু জায়গায় ভারত সংঘর্ষ বিরতি লঙ্ঘন করেছে, আমাদের বাহিনী দায়িত্বশীল ও সংযতভাবে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে।’
দ্বিতীয়ত বার্তা, অতীত বলছে, পাকিস্তানের সরকার ও সেনা, একেবারে দুই মেরুর বাসিন্দা। একজন উত্তর বললে, অন্য জন বলে, দক্ষিণ। সেনার প্রিয় যে সরকারও তার। এক সময় শরিফের মতো তৎকালীন সেনাপ্রধানের প্রিয় ছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও। এখন তিনি জেলে। প্রধানমন্ত্রী পদ খুইয়েছিলেন অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে। কিন্তু অনেকেই মনে করেন, ইমরানের সরকার ফেলতে সেই বারও পালে হাওয়া দিয়েছিল পাকিস্তানি সেনা কর্তারা। শনিবার যখন সংঘর্ষ বিরতির জন্য আমেরিকাকে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি, ‘জয়ের হাসি’ হেসে এই চুক্তিকে দেশবাসীর জিত বলে আখ্যান দেন পাক প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। সেই বার্তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংঘর্ষ বিরতি ভেঙে দেয় পাকিস্তান। কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ রেখা-সহ মোট ১১টি জায়গায় চলে গুলি। আকাশে উড়তে দেখা যায় পাক ড্রোন। অন্ধকারে ঢেকে যায় গোটা শ্রীনগর। জম্মু ডিভিশনের নাগরোটা সেনা ছাউনিতেও হানা দেয় কয়েক জন দুষ্কৃতী। ভারতীয় জওয়ানদের লক্ষ্য করে চালায় গুলিও। বিকাল পাঁচটায় সংঘর্ষ বিরতি ঘোষণা, রাত ৯টায় লঙ্ঘন, তবে কি ফের বিপরীত মেরুতে চলছে পাক সরকার ও সেনা? নাকি আবার ঘুরপথে পাকিস্তানে নিজেদের শাসন ফেরাতে চাইছে সেনা?
তৃতীয় বার্তা, যদি সত্যিই ঘুরপথে সেনার শাসনে থাকে পাকিস্তান, তবে ঠিক কোন কাজের জন্য ঋণ নেয় তারা, সেই নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করছে ওয়াকিবহাল মহল। সম্প্রতি, ভারতের বিরোধিতার পরেও পাকিস্তানকে ১০০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দিতে রাজি হয়ে যায় আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার। পহেলগাঁও হামলার পর থেকেই পাকিস্তানের এই কুড়িয়ে বাড়িয়ে টাকা তোলার বিরোধিতা করেছিল ভারত। এই টাকা যে আদৌ ঘুরপথে সন্ত্রাসে মদত দিতেই নেয় তারা, সেই নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছিল নয়াদিল্লি। এমনকি, ভারত IMF ঋণ সংক্রান্ত বোর্ডের বৈঠকে ভোটদানে বিরত থেকে জানায়, এই ঋণের টাকা সদ্বব্য়বহারের ক্ষেত্রে খারাপ রেকর্ড রয়েছে পাকিস্তানের। কিন্তু তারপরে ঋণ পেয়ে যায় তারা। আর তারপরেই সংঘর্ষ বিরতি। ফলত, নতুন করে সেই টাকা যে কোন খাতে ব্যবহার করবে পাকিস্তানের ‘সেনা চালিত শরিফ সরকার’, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে আশঙ্কা।
