আমাদের ঝগড়া হলে বুদ্ধমামাই মেটাতেন: ঊষসী চক্রবর্তী – Bengali News | This is what actress ushasie Chakraborty said about Buddhadeb bhattacharya on his sad demise
অভিনেত্রী ঊষসী চক্রবর্তীর কলমে তাঁর বুদ্ধমামা…
তিনি প্রয়াত বাম রাজনীতিক শ্যামল চক্রবর্তীর কন্যা ঊষসী চক্রবর্তী। ছোটবেলা থেকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর সান্নিধ্য পেয়ে বড় হয়েছেন। আজ তাঁর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছেন ঊষসী। তাঁর মনের মধ্যে ফিরে-ফিরে আসছে অজস্র স্মৃতি। প্রিয় বুদ্ধমামাকে শ্রদ্ধা জানাতে টিভি নাইন বাংলা ডিজিটালের হয়ে কলম ধরলেন অভিনেত্রী ঊষসী চক্রবর্তী।
অনেকদিন থেকেই অসুস্থ ছিলেন বুদ্ধমামা। কিন্তু তাঁর চলে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি ছিল না। এই মুহূর্তে আমার মনে অনেক-অনেক স্মৃতি জমা হচ্ছে। বুঝতে পারছি না, প্রকাশ্যে কতখানি বলা উচিত। কিছু স্মৃতি সত্যিই ব্যক্তিগত। তবুও এই লেখাটা আমি লিখছি। কিছু কথা আমি পাঠকের সঙ্গেও শেয়ার করে নিতে চাই।
আমাদের রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে আমি ছোটবেলা থেকেই ‘মামা’ সম্বোধন করি। বিমান বসু, বুদ্ধমামা, আমার বাবা (শ্যামল চক্রবর্তী)–এই গোটা প্রজন্মটাই পশ্চিমবঙ্গের স্বচ্ছ ও সৎ রাজনীতিকে প্রতিনিধিত্ব করেছে। বিষয়টা আমার অত্যন্ত কাছ থেকে দেখা। Incorruptible বলে ইংরেজিতে একটা কথা আছে। এটা এখনকার দিনে হয়তো হয় না। কিন্তু আমি আমার জীবনে এমন মানুষকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। বাড়িতে বাবা তাই ছিলেন। বুদ্ধমামার ক্ষেত্রেও আমি এই কথাটাই বলতে চাইব। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও কীভাবে সৎ থাকা যায়, বুদ্ধমামা তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। সেই স্বচ্ছতার রাজনীতির ঐতিহ্য যদি আমরা আমাদের দেশের রাজনীতিতে ফেরত পাই, তা হলে সেটাই হবে আমাদের ওঁর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য।
বুদ্ধমামার সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি রয়েছে। মাত্র ৫ বছর বয়সে মাকে হারিয়েছিলাম। সেই সময় আমরা খুবই অসহায় পরিস্থিতিতে পড়ে যাই। মা-ই ছিলেন আমাদের পরিবারের একমাত্র রোজগেরে মানুষ। তিনি স্কুলে পড়াতেন। বাবা ছিলেন পার্টির সর্বক্ষণের সদস্য। সেই সময় বুদ্ধমামা, অনিলমামা, বিমানমামাদের কাছে নিরাপত্তা পেয়েছি। ওঁরা না থাকলে আমি বড়ই হতে পারতাম না। তাই এটা আমার কাছে ব্যক্তিগত ক্ষতিই। আমরা একসঙ্গে বেড়াতে যেতাম। আমার মনে আছে, ছোটবেলায় একবার আমরা সবাই মিলে দিঘায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। কত মজা করেছিলাম। পরবর্তীকালে সাংবাদিকতা করছিলাম যখন ভেনিজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎকার নিতে সাহায্য করেছিলেন বুদ্ধমামাই। অনেক-অনেক স্মৃতি…।
আমার সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তিকে বাড়াতে সাহায্য করেছিলেন এই বুদ্ধমামাই। আমার বাবাও জানতেন মেয়ে যদি আমার কথা নাও শোনে, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর কথা শুনবেই। বাবার মতের সঙ্গে আমার মতের মিল হত না অনেক সময়ই। বাবার সঙ্গে ঝগড়া হলেও বুদ্ধমামার কাছেই যেতাম। বাবা-মেয়ের ঝগড়াও মেটাতেন বুদ্ধমামাই। কিন্তু একটা বিষয় রয়েছে–সুচেতন (বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর একমাত্র সন্তান) এবং আমি, আমাদের বন্ধুত্বটা বজায় রাখতে পেরেছি। আমি আশা করি, আমাদের সখ্যতা থাকবে আজীবন।
সবার শেষে একটাই কথা বলব, মানুষের প্রতি ভালবাসা এবং সততার রাজনীতির মুখ হিসেবে আমার বুদ্ধমামা ভারতবর্ষের রাজনীতিতে উদাহরণ হয়েই থাকবেন। আমি নিজে যদি কখনও সক্রিয় রাজনীতি করি, এই সততার রাজনীতিই করব। যে সততার রাজনীতির ধারা বুদ্ধমামারা আমার মধ্যে সঞ্চারিত করেছেন। ‘কর্ণ কুন্তি সংবাদ’-এর একটি লাইন আমার বাবা মাঝেমধ্যেই বলতেন–‘জয় লোভে, যশ লোভে, রাজ্য লোভে অভি, বীরে সদ্গতি থেকে ভ্রষ্ট নাহি হই।’ কথাটা আমার বারবারই মনে পড়ছে আজ…। অসম্ভব সম্মানের সঙ্গে চলে গেলেন আমার বুদ্ধমামা। বীরের সদ্গতি উনি পেয়েছেন। লাল সেলাম।