Indian Navy | ২০২৬ সালে নৌবাহিনীতে ১৮ যুদ্ধজাহাজ, ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বহর বৃদ্ধি
২০২৬ সাল ভারতীয় নৌবাহিনীর (Indian Navy) জন্য ঐতিহাসিক হতে চলেছে। এক বছরেই ১৮টি যুদ্ধজাহাজ অন্তর্ভুক্ত বা কমিশন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের দাবি, নৌবাহিনীর ইতিহাসে এক বছরে এটিই হতে চলেছে সবচেয়ে বড় বাহিনী সম্প্রসারণ। দিল্লির নৌসেনা ভবনে অনুষ্ঠিত নৌবাহিনীর কমান্ডার্স কনফারেন্সে দেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা, যুদ্ধপ্রস্তুতি এবং ভবিষ্যৎ সক্ষমতা নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা হয়েছে।
২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত তিন দিন ধরে চলে ২০২৬ সালের দ্বিতীয় নৌবাহিনী কমান্ডার্স কনফারেন্স। এই সম্মেলনে নৌবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব অপারেশনাল প্রস্তুতি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ সক্ষমতা বৃদ্ধির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করে।
এক বছরে ১৮টি যুদ্ধজাহাজ
প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং সম্মেলনে জানান, ২০২৬ সালে ভারতীয় নৌবাহিনীতে ১৮টি যুদ্ধজাহাজ অন্তর্ভুক্ত বা কমিশন করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই সম্প্রসারণ ভারতের দেশীয় নৌ-জাহাজ নির্মাণ পরিকাঠামোর ক্রমবর্ধমান সক্ষমতার প্রতিফলন।
দেশে তৈরি যুদ্ধজাহাজে দেশীয় প্রযুক্তি ও উপাদানের ব্যবহারও বাড়ছে। নৌবাহিনীর সাম্প্রতিক কমিশন করা যুদ্ধজাহাজগুলিতে ৭৫ শতাংশের বেশি দেশীয় উপাদান থাকার বিষয়টি সম্মেলনে গুরুত্ব পেয়েছে। ভবিষ্যতে শুধু দেশের প্রয়োজন মেটানো নয়, বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলিতে যুদ্ধজাহাজ রপ্তানির সক্ষমতা তৈরির দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে।
ভারত মহাসাগর থেকে আটলান্টিক, বাড়ছে নৌবাহিনীর উপস্থিতি
ভারতীয় নৌবাহিনীর অপারেশনাল পরিসরও আগের তুলনায় বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে ভারতীয় যুদ্ধজাহাজ দক্ষিণ চিন সাগর, ভূমধ্যসাগর এবং আটলান্টিক মহাসাগরেও মোতায়েন রয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের মতে, এই উপস্থিতি ভারতীয় নৌবাহিনীর ব্লু-ওয়াটার সক্ষমতা এবং বিস্তৃত সামুদ্রিক ভূমিকার দিকটি তুলে ধরে।
হিন্দ মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতকে প্রথম প্রতিক্রিয়াদাতা এবং পছন্দের নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে তুলে ধরে রাজনাথ সিং সামুদ্রিক নজরদারি ও প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। সমুদ্রপথে যান চলাচল বাড়ার পাশাপাশি প্রতারণা, বিভ্রান্তিমূলক কার্যকলাপ এবং গ্রে-জোন কার্যকলাপের মতো চ্যালেঞ্জও বাড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পশ্চিম এশিয়ার সংকটে অপারেশন উর্জা সুরক্ষা
পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতির মধ্যেও ভারতীয় নৌবাহিনীর ভূমিকা সম্মেলনে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী অপারেশন উর্জা সুরক্ষা-র মাধ্যমে ভারতীয় পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ, যার মধ্যে এলপিজি ট্যাঙ্কারও রয়েছে, হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে নিরাপদে চলাচলে নৌবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেন।
হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে সম্পর্কও নৌবাহিনীর ভবিষ্যৎ ভূমিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
এআই, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ও আনম্যানড সিস্টেমে জোর
কমান্ডার্স কনফারেন্সে শুধু যুদ্ধজাহাজ বা প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা নয়, ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা অ্যানালিসিস, স্বয়ংক্রিয় ও আনম্যানড সিস্টেম এবং সাইবার অপারেশনের মতো ক্ষেত্রে প্রযুক্তি গ্রহণের গতি বাড়ানোর উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে দেশীয় প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তি আত্মীকরণকে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর লক্ষ্য ভবিষ্যতের সামুদ্রিক যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ, নজরদারি এবং প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা বাড়ানো।
নারী অফিসারদের ‘অল র্যাঙ্কস, অল রোলস’ ভূমিকা
নৌবাহিনীতে নারী অফিসারদের ভূমিকা বৃদ্ধির বিষয়টিও সম্মেলনে উঠে এসেছে। ‘অল র্যাঙ্কস, অল রোলস’ নীতির অধীনে নারী অফিসাররা এখন ফ্রন্টলাইন যুদ্ধজাহাজ এবং বিমানেও দায়িত্ব পালন করছেন। নৌ অভিযানের ক্ষেত্রেও তাঁদের অংশগ্রহণ বাড়ছে।
এর মধ্যে নবিকা সাগর পরিক্রমা-র মতো দীর্ঘ সামুদ্রিক অভিযানও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সহযোগিতাতেও ভারতের ভূমিকা
ভারত সম্প্রতি কম্বাইন্ড মেরিটাইম ফোর্সেসের অধীনে কম্বাইন্ড টাস্ক ফোর্স-১৫৪-এর কমান্ড গ্রহণ করেছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের মতে, এটি আঞ্চলিক সহযোগিতামূলক নিরাপত্তায় ভারতের নৌবাহিনীর ভূমিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
এছাড়া কোচিতে অনুষ্ঠিত অপারেশন সাদার্ন রেডিনেস-এ ২৭টি দেশের ২৭৬ জন সদস্য অংশ নেন। অন্যদিকে, আইএনএস সুদর্শিনীকে ‘লোকায়ন-২৬’-এ মোতায়েনের মাধ্যমে আমেরিকা, আটলান্টিক এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের সামুদ্রিক কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও জোরদার হয়েছে।
‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর সঙ্গে নৌবাহিনীর ভূমিকা
সরকারের ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’ লক্ষ্যের সঙ্গে নৌবাহিনীর ভূমিকা যুক্ত করার কথাও সম্মেলনে তুলে ধরা হয়েছে। সামুদ্রিক সীমান্ত রক্ষা করার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় নৌবাহিনীর ভূমিকা আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
২০২৬ সালে ১৮টি যুদ্ধজাহাজ অন্তর্ভুক্তির পরিকল্পনা সেই বৃহত্তর সক্ষমতা বৃদ্ধিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাশাপাশি দেশীয় জাহাজ নির্মাণ, নতুন প্রযুক্তি, দূরবর্তী সমুদ্র অঞ্চলে মোতায়েন এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সহযোগিতার মাধ্যমে ভারতীয় নৌবাহিনীর ভবিষ্যৎ অপারেশনাল পরিসরও ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে।
Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট। ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।