নেপালে হড়পা বানে মৃত বেড়ে ৪৬৯, নিখোঁজ ২৯০ ভারতীয়, নয়া আতঙ্ক জলবোমা
কাঠমাণডু: চোখের সামনে আস্ত পাহাড় যেন ধসে পড়েছে জনপদের ওপর। আর তার জেরে সৃষ্ট প্রলয়ঙ্করী হড়পা বানে (Flash floods) নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে এখন শুধুই…
কাঠমাণডু: চোখের সামনে আস্ত পাহাড় যেন ধসে পড়েছে জনপদের ওপর। আর তার জেরে সৃষ্ট প্রলয়ঙ্করী হড়পা বানে (Flash floods) নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে এখন শুধুই মৃত্যুমিছিল। শুক্রবার পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা এক ধাক্কায় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬৯। ধ্বংসস্তূপ ও পুরু কাদার তলায় এখনও চাপা পড়ে রয়েছেন অন্তত ১,৪৬৮ জন, যাঁদের মধ্যে অন্তত ২৯০ জন ভারতীয় নাগরিক। স্বজনহারাদের কান্নায় যখন বাতাস ভারী, ঠিক তখনই উদ্ধারকারীদের কপালে ভাঁজ ফেলেছে এক নতুন আতঙ্ক, নদীর উৎসমুখে আচমকা তৈরি হওয়া এক বিশাল হ্রদ বা ‘জলবোমা’, যা ফাটলে দ্বিতীয়বারের জন্য মহাপ্রলয়ের সাক্ষী হতে পারে নেপাল!
এই প্রলয়ঙ্করী বিপর্যয়ে নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন ভারতের অন্তত ২৯০ জন নাগরিক। বিদেশ মন্ত্রক (MEA) জানিয়েছে, নিখোঁজদের মধ্যে অনেকেই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী এবং বিভিন্ন রাজ্য থেকে যাওয়া পর্যটক। তাঁদের সঙ্গে এখনও কোনও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এই চরম উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লিতে চিনে ও নেপালে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে জরুরি ভারচুয়াল বৈঠক করেছেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। নিখোঁজ ভারতীয়দের সন্ধানে ইতিমধ্যেই একটি ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের সঙ্গে কথা বলে সব রকম মানবিক সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে অন্ধকারের মধ্যেও কিছুটা আশার আলো দেখা গিয়েছে উদ্ধারকাজে। এখনও পর্যন্ত ৮৪ জন ভারতীয়কে সুরক্ষিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকেই উদ্ধার হয়েছেন ৬৩ জন। এছাড়া রাসুয়া থেকে উদ্ধার হওয়া ২৭ জন বিদেশি পর্যটকের মধ্যে ১১ জন ভারতীয়ও রয়েছেন। দুর্যোগের কারণে দিল্লি-কাঠমান্ডু বাস পরিষেবা আপাতত বাতিল করা হয়েছে।
ভূমিকম্প নয়, প্রলয়ের কারণ হিমবাহ ধস
প্রাথমিক ভাবে ভূমিকম্পের কথা বলা হলেও, মার্কিন জিওলজিক্যাল সার্ভে (USGS) স্পষ্ট জানিয়েছে, কোনও ভূমিকম্প নয়, বরং তিব্বত-নেপাল সীমান্তে লেন্দে নদীর (Lhende River) কাছে ভয়াবহ হিমবাহ ধস বা ‘আইস-রক অ্যাভাল্যাঞ্চ’-এর জেরেই এই মহাপ্রলয় ঘটেছে। ধসের জেরে নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে যে বিপুল জলরাশি জমেছিল, তা একসময় বাঁধ ভেঙে প্রবল বেগে ভোতে কোশী এবং ত্রিশূলী নদীর অববাহিকায় আছড়ে পড়ে।
নতুন করে হ্রদ তৈরির আতঙ্ক
বিপদ কিন্তু এখনও কাটেনি। চিনা প্রশাসন জানিয়েছে, ভোতে কোশী নদীর উৎসমুখে নতুন করে একটি প্রাকৃতিক হ্রদ (Barrier lake) তৈরি হয়েছে, যেখানে ইতিমধ্যেই প্রায় ২০ লক্ষ ঘনমিটার জল জমেছে। আগামী তিন দিনে আরও ৩০ লক্ষ ঘনমিটার জল সেখানে জমতে পারে। এই প্রাকৃতিক বাঁধটি কোনওভাবে ভেঙে গেলে ফের এক ভয়ঙ্কর হড়পা বান ধেয়ে আসবে, যা গোটা পরিস্থিতিকে হাতের বাইরে নিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
ধূলিসাৎ জনপদ, স্বজনহারাদের হাহাকার
রাসুয়া এবং নুয়াকোট জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন পুরু কাদা ও ধ্বংসস্তূপের নিচে। ৪২ কিলোমিটার রাস্তা, ৮০টির বেশি সেতু এবং ত্রিশূলী ও দেবীঘাট জলবিদ্যুৎ প্রকল্প কার্যত নিশ্চিহ্ন। কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন হাসপাতাল থেকে চিতওয়ানের ভরতপুর হাসপাতাল, সর্বত্রই নিখোঁজ পরিজনদের খোঁজে স্বজনহারাদের ভিড়। মর্গের বাইরে লাশের সারি। তিমুরে চোখের সামনে স্ত্রী এবং চার ছেলেমেয়েকে বানের জলে ভেসে যেতে দেখেছেন আটত্রিশ বছরের গিরি লাল। নিজে কোনওক্রমে প্রাণে বাঁচলেও, হাসপাতালে শয্যাশায়ী গিরির চোখে এখন শুধুই শূন্যতা। এক বৃদ্ধার কথায়, “চোখের সামনে বাজার, গ্রাম, সরকারি অফিস সব ধুয়েমুছে গেল। এমন তাণ্ডব জীবনেও দেখিনি!”
পাশে ভারত
এই চরম দুঃসময়ে বন্ধু রাষ্ট্র নেপালের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছে ভারত। উদ্ধারকাজের পাশাপাশি, ইতিমধ্যেই সামরিক বিমানে ৪৭.৫ টন ত্রাণসামগ্রী (অস্থায়ী তাঁবু, কম্বল, সোলার ল্যাম্প, ওষুধ ও খাবার) নেপালে পাঠিয়েছে সাউথ ব্লক। কিন্তু কাদা আর ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে যত সময় এগোচ্ছে, মৃত্যুর পরিসংখ্যান আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কাই জোরাল হচ্ছে।
নেপালে বানের জলে ভাসছে গ্যাস সিলিন্ডার, ধরতে কাদাজলে ঝাঁপ
৩০ মিনিটে ৩০ ফুট জলোচ্ছ্বাস! নেপালে হড়পা বানে মৃত ১৫৭, নিখোঁজ ১৩৩ ভারতীয়