ধীরে বন্ধু, ধীরে চললে কি তাকে নতুন করে পাওয়া যায়
চিত্রণে নিশীথের নিরালোক অরণ্য। জীবনের বিচিত্র জটিল হিংস্র রিপুগ্রস্ত অবস্থানের প্রতীক আদিম অন্ধকার আরণ্যক দিশাহীনতা। চোখের দৃষ্টি এখানে বধির, তাই শ্রবণেন্দ্রিয় দর্শনক্ষম। প্রিয়তমর চরণশব্দ বরণ করাই এই ক্ষণে কাঙ্ক্ষিত গতি। যিনি নিজের পথ জানেন, তাঁর দ্রুততার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা অজ্ঞানীর অসাধ্য। তাই সমগ্র গানে ধীরে চলার আবেদন অতি প্রগাঢ়, নিবিড়, মধুর সমর্পণের আবেগ-বিমণ্ডিত। যদি প্রকারান্তর ভাবা যায়, এই ধীরতা কি জীবনের লক্ষ্য ও সার্থকতার পক্ষে অন্যতম মন্ত্র নয়? বিশেষত আজকের সময়ে, যখন স্থৈর্য ও ধীরত্ব অগুণ পরাজিতের লক্ষণ! যখন আত্মোপলব্ধির প্রয়াস ব্রাত্য, দিনশেষে পরছিদ্রান্বেষণ, মৎসরতা ও অপকৃষ্ট মন্তব্যময় অধিবাস্তবতার সমাজ গ্রাস করে চিন্তাবৃত্তি! ফাঁকা লোক প্রজ্ঞানী ও প্রবুদ্ধ ছদ্মবেশ ধরতে পরবর্তী দুরাচারের আয়োজনে সাজঘরে ঢুকে পড়ে!
আজ থেকে একশো এগারো বছর আগে যখন রবীন্দ্রনাথ এই গান রচনা করেছেন, তখন ভারতের জনমানসে নব্যবীক্ষণের জোয়ার ঠিকই, কিন্তু আজকের অনাকাঙ্ক্ষিত চারিত্র যে অনুপস্থিত ছিল, বা আজকের চেয়ে কম ছিল, এমনটা নয়। সেই সময়ের যত মনীষীর কর্মপরিধির কাছে আমরা নতশির, তাঁরা প্রত্যেকেই মানবমনের অপরিশীলিত আচরণে ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন। তবে একশো বা দেড়শো বছর আগেকার সাধারণ জনপ্রকৃতি এ কালের পক্ষে সান্ত্বনার নয়, দুঃখের। বিজ্ঞান প্রাগ্রসরমাণ, প্রযুক্তি অগণিত সুবিধাসহ সমাজ এগিয়ে নিয়ে চলেছে যেন সাজুগুজু কনেবৌয়ের পাল্কিবাহক, দেশে নিরক্ষরতার হার তলানিতে, প্রতিনিয়ত পালটে যাচ্ছে দারিদ্রের সংজ্ঞা, শ্রেষ্ঠ আসন না পেলেও ভারত এখন জগৎসভায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। এমন অবস্থায় ন্যায়নিষ্ঠ, উন্নত মননশীল, সমদর্শী, সহমর্মী ও হ্রস্বাবিল গণহৃদয়ালোক প্রত্যাশা আকাশকুসুম না হওয়ারই কথা ছিল। কিন্তু আজও, ভিতর-বাহির কালোয় কালো, এই বোধটুকুরও দেখা মেলে না। ‘গীতবিতান’-এর দর্শনভাগ কি সেই বোধ জাগিয়ে তুলতে পারবে? অন্তহীন কামনা থেকে পৌঁছে দিতে পারবে কি পরিমিতি-চেতনায়? সেই যে সেই সব গান, যেখানে আছে, ‘না হয় তোমার যা হয়েছে তাই হল।/ আরও কিছু নাই হল, নাই হল, নাই হল।।’