স্মৃতি ও মেঘদূতের টানে: অমর মিত্রের উজ্জয়িনী সফর
প্রিয় নগর উজ্জয়িনী পুণ্যধাম
অমর মিত্র
কশ্চিৎ কান্তাবিরহগুরুণা স্বাধীকার প্রমত্ত,
শাপেনাস্তংগ্মিত মহিমা বর্ষভোগ্যেণ ভরতুঃ।
মহাকবি কালিদাসের মেঘদূতম কাব্যের শুরু এই, নিজ কারযে অমনোযোগের জন্য কোনও এক যক্ষ কুবেরের শাপগ্রস্ত হয়। কান্তা বিরহে দুঃসহ এক বর্ষভোগ্য ঐ শাপের ফলে বিগতমহিমা হয়ে সে রামগিরি আশ্রমে বসতি করল।
সেই নির্বাসিত যক্ষই আষাঢ়ের প্রথম দিবসে হিমালয়ের দিকে যাত্রা করা মেঘের মাধ্যমে তার প্রিয়ার কাছে বার্তা পাঠায়। মেঘের যাত্রাপথই মেঘদূত কাব্য। সেই যাত্রাপথে উজ্জয়িনী আসে। আমি মেঘদূতম পাঠ করে উজ্জয়িনীকে চিনেছিলাম। অপরূপ বর্ণনা দিয়েছিলেন কবি তাঁর এই মানসভূমির। না কালিদাসের সেই নগর কল্পিত নগর নয়। আমি আমার যৌবনকালে তাকে আবিষ্কার করতে চেয়েছিলাম ধ্রুবপুত্র উপন্যাস রচনার ভিতর দিয়ে।
উজ্জয়িনী বহুদিন যাইনি, যাব কি, যখনই যাব বলি, উড়ানের কথা বলে স্বজন বন্ধুরা। ইন্দোর অবধি আকাশে, তারপর গাড়িতে উজ্জয়িনী। ওভাবে আমি যাব না, যেভাবে ভারতবর্ষকে সঙ্গে করে উজ্জয়িনী গিয়েছি বারবার তাতে কেউ রাজি নন। এখন হাওড়া থেকে ইন্দোর, শিপ্রা এক্সপ্রেস ট্রেন আছে, ৩৬ ঘন্টা লাগে। কিন্তু সেই যে সেই যাওয়া, আহমেদাবাদ এক্সপ্রেস বা বম্বে মেলে জুড়ে থাকা ইন্দোর বগি বিলাসপুর-ইন্দোর এক্সপ্রেস বা ছত্তিশগড় এক্সপ্রেস ট্রেনে জুড়ে দেওয়া, তা আর নেই। এমনও হয়েছে ছ-সাত ঘন্টা ফেলে রেখে দিল সেই বগি, তারপর তা টেনে নিয়ে চলল অন্য ট্রেন। নাগপুরে গিয়ে জুড়ে দিল অপেক্ষা রত ইন্দোর এক্সপ্রেসের সঙ্গে। এখন সরাসরি ট্রেনে সরল হয়েছে এই অতীত যাত্রা, কালিদাসের জন্মভূমিতে যাওয়া। আমি এক সময় উজ্জয়নী অনেক গিয়েছি। মনে হয় পাঁচ থেকে ছয় বার। গিয়েই ধ্রুবপুত্র উপন্যাস লেখার সূত্র পাই। আর সেই উপন্যাসের জন্য উজ্জয়িনী, বিদিশা ঘুরে ঘুরে যাওয়া। মনে পড়ে সেই দেওয়াস রোড, আজাদ নগর কলোনি, ফ্রিগঞ্জ, মধুশালা, ঘড়ি ঘর, কালিদাস একাডেমিতে মালবিকা অগ্নিমিত্রম সংস্কৃত নাটক, মিউজিয়ম, বিক্রমাদিত্য ইউনিভারসিটি-সব। তা বাদে উজ্জয়িনীর দর্শন হত পাঠান আমলের নানা ধ্বংসস্তূপ, মন্দিরময় নগর আর কালিদাসের মেঘদূতম কাব্যের মহাকাল মন্দির দর্শন।