এন্ট্রান্স নিতে পারে রাজ্য বোর্ডই, মত বহু শিক্ষাবিদের - 24 Ghanta Bangla News
Home

এন্ট্রান্স নিতে পারে রাজ্য বোর্ডই, মত বহু শিক্ষাবিদের

Spread the love

রাজেন্দ্রনাথ বাগ

তামিলনাড়ু বোর্ডের দ্বাদশের পরীক্ষায় মেয়েটি পেয়েছিল ১২০০-র মধ্যে ১১৭৬ (৯৮%)। সে ডাক্তার হতে চেয়েছিল। ডাক্তারি-প্রবেশিকা নিট-ইউজি-তে সেই মেয়েই ৭২০-তে মাত্র ৮৬ পেয়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। অনেক পরীক্ষার্থীকেই হতাশা গ্রাস করেছিল। ঘটনাটি ২০১৭-র। তার আগের বছরই সবে দেশের ১০০ শতাংশ ডাক্তারি আসনে ভর্তিতে নিট-ইউজি চালু হয় স্থায়ী ভাবে। তার আগে অল ইন্ডিয়া প্রি-মেডিক্যাল টেস্ট হতো, কিন্তু তা ছিল ১৫ শতাংশ আসনে সীমাবদ্ধ। বাকি দায়িত্ব থাকত রাজ্য বোর্ডের হাতেই। ২০১৭-য় ফের রাজ্যগুলির হাতে ডাক্তারি-প্রবেশিকা ফেরানোর দাবি ওঠে। সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয় যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় যুগ্ম-তালিকাভুক্ত শিক্ষায় রাজ্যের অধিকার ফেরতের দাবিতে।

আরিয়ালুর জেলার কুঝুমুর গ্রামের দিনমজুর বাবার সন্তান দলিত কিশোরী সম্মুগম অনিতাও মামলায় পক্ষ হয়েছিল। রাজ্য বোর্ডে পড়াশোনা করা গ্রামীণ এলাকার গরিব পড়ুয়াদের অসহায়তা তুলে ধরে তার বক্তব্য ছিল, এমসিকিউ ভিত্তিক নিট-ইউজি-তে জানাবোঝার গভীরতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা নেই। অনেক অর্থব্যয়ে স্পেশাল কোচিং যারা নিতে পারে এবং সিবিএসই বোর্ডে পড়াশোনা করা শহুরে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের কথা ভেবেই যেন তৈরি পরীক্ষার কাঠামো। তবে রাজ্যের হাতে প্রবেশিকা ফেরানো বা দ্বাদশের ফলের ভিত্তিতে ভর্তির আর্জি আমল পায়নি সুপ্রিম কোর্টে। ২০১৭-র ১ সেপ্টেম্বর আত্মহত্যা করে বছর সতেরোর অনিতা।

২০১৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত নিট-ইউজি পরিচালনা করত সিবিএসই বোর্ডই। ২০১৯-এ তৈরি হয় ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)। ২০২৪-এর পরে ২০২৬-এ ফের নিটের প্রশ্ন ফাঁসে আলোড়িত গোটা দেশ। এনটিএ তথা সর্বভারতীয় প্রবেশিকা বাতিলের দাবিও ফের সজোরে হাজির জনপরিসরে। শুধু নিট-ইউজি, পিজিই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রবেশিকাও (সিইউইটি) নেয় এনটিএ। অথচ এনটিএ-র কর্মী মূলত চুক্তিভিত্তিক। দায়িত্বে শিক্ষাবিদ নন, আছেন আমলারা। প্রশ্নপত্র ছাপা, বিতরণ, সেন্টারের ব্যবস্থাপনা, মূল্যায়নের ভারও এনটিএ আউটসোর্স করে দেয়। কী করে এমন এক সংস্থা ভূভারতের লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যতের নির্ণায়ক হতে পারে, সে প্রশ্ন বহু শিক্ষাবিদেরও।

তাঁদের বক্তব্য, এনটিএ সংসদে কৈফিয়ৎযোগ্যও নয়। শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট কারও ভূমিকা নেই। আইনি পড়াশোনার প্রবেশিকা ‘ক্ল্যাট’ পরিচলনা করে কনসর্টিয়াম অফ ন্যাশনাল ল ইউনিভার্সিটিজ, যা উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে তৈরি। ভবিষ্যতের আইনজীবী বাছাইয়ের যোগ্যতা রয়েছে কনসর্টিয়ামের। এনটিএ-র সেই দক্ষতা বা পরিকাঠামোই নেই।

রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকারের বক্তব্য, ‘বিকেন্দ্রীকৃত পরীক্ষার যেমন ত্রুটি, সীমাবদ্ধতা অতীতে দেখা গিয়েছে, কেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থাতেও সুরাহা হয়নি। কেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থায় সামাজিক, ভৌগোলিক সমস্যাও রয়েছে। গ্রামীণ, গরিব পড়ুয়াদের সমস্যা বেশি। আর এমসিকিউ সীমাবদ্ধ থাকতে পারে পরীক্ষার মোট মার্কসের বড়জোর ২০ শতাংশে। বাকিটা ব্যাখ্যামূলক উত্তরেই যোগ্যতা যাচাই হওয়া উচিত।’

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রো-ভিসি ও রাজ্য জয়েন্ট এন্ট্রান্স বোর্ডের প্রাক্তন চেয়ারপার্সন সিদ্ধার্থ দত্ত মনে করেন, ‘সারা ভারতে সমান ভাবে প্রবেশিকা পরিচালনা অত্যন্ত কঠিন। বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় প্রশ্নপত্র তৈরির প্রক্রিয়ায় গোপনীয়তা নষ্টের আশঙ্কাও প্রবল।’ বিভিন্ন বোর্ডের পঠনপাঠনের বৈচিত্র স্মরণ করিয়ে তাঁর মন্তব্য, ‘এমসিকিউ ভিত্তিক পরীক্ষায় জ্ঞানের গভীরতা যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত। এমন পরীক্ষায় যথাযথ ইনভিজিলেশনের গুরুত্ব অসীম। কিন্তু সর্বভারতীয় ব্যবস্থায় সর্বত্র নিখুঁত ইনভিজিলেশন নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।’

তাঁর মতে, ‘রাজ্য বোর্ডের হাতেই প্রবেশিকার ভার থাকা উচিত।’ আইআইটি খড়্গপুর ও আইজার কলকাতার ভূতপূর্ব অধ্যাপক পদার্থবিজ্ঞানী সৌমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘এমসিকিউ ভিত্তিক পরীক্ষা কারও জ্ঞান ও চিন্তাগত যোগ্যতা যাচাইয়ের মাপকাঠি হতে পারে না। তবু, পরীক্ষার্থীর বিশাল সংখ্যা মাথায় রেখে প্রাথমিক পর্যায়ে কম্পিউটার বেসড এমসিকিউ ভিত্তিক পরীক্ষা হতে পারে। কিন্তু পরের ধাপে অপেক্ষাকৃত কমসংখ্যক পরীক্ষার্থীর জন্য ব্যাখ্যামূলক লিখিত পরীক্ষাই হওয়া উচিত। আর পরীক্ষার ভার আমলা–নির্ভর ব্যবস্থা নয়, থাকা উচিত অ্যাকাডেমিক লোকজনের হাতেই।’ রাজ্যের প্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে আগের মতো রাজ্য জয়েন্ট বোর্ডই পরীক্ষা নিতে পারে বলেও তাঁর মত। কারণ, ব্যবস্থাটা পরীক্ষিত।

পশ্চিমবঙ্গ প্রধান শিক্ষক সমিতির সম্পাদক কৃষ্ণাংশু মিশ্র মনে করেন, ‘সিবিএসই বা আইসিএসই বোর্ডের শিক্ষণ পদ্ধতির সঙ্গে রাজ্য বোর্ডগুলির শিক্ষণ পদ্ধতির ফারাক রয়েছে। রাজ্যের প্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে রাজ্য জয়েন্ট বোর্ডই পরীক্ষা নেওয়ার উপযুক্ত। তাতে পরীক্ষার্থীর যোগ্যতার আরও ভালো মূল্যায়ন সম্ভব। অতীতে রাজ্য জয়েন্টের মাধ্যমে পড়তে ঢুকে আজ যাঁরা ডাক্তার, তাঁদের যোগ্যতা কি কোথাও কম?’

অনেক শিক্ষাবিদের পর্যবেক্ষণ, পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতে পড়াশোনার ধরন ঐতিহ্যগত ভাবে আলাদা, বিশদে জানায় জোর বেশি। অন্য দিকে, উত্তর ভারতে সিবিএসই বোর্ডের প্রভাব এবং এমসিকিউ ভিত্তিক পরীক্ষায় অভ্যস্ততা বেশি। উত্তর ভারতে কোচিং বাণিজ্যের বিস্তারও লক্ষণীয়। কোচিং সেন্টারের খরচ টানার ক্ষমতা রয়েছে কম পরিবারেরই। ফলে ছাঁটাই হচ্ছে গ্রামীণ ও গরিব ছেলেমেয়েরা। কোচিং বাণিজ্যের হাত ধরেই প্রশ্ন-বিক্রি, ফাঁসেরও রমরমা বলে মত একাংশ শিক্ষাবিদের।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *